Bhalukanews.com

বিদেশ থেকে আসছে চাল কমছে না দাম

অর্থ নৈতিক প্রতিবেদক: রমজানের ঈদের আগে ও পরে বাজারে মাঝারি ও সরু চালের দাম ছিল ৭০-৭৫ টাকা কেজি। মোটা ৬০-৬৫ টাকা। কিন্তু দেশের খাদ্য খাটতি পূরণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির ঘোষণা দেয় সরকার। এ লক্ষ্যে চালের মূল্য অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির মুখে সরকার আমদানি শুল্কও কমিয়ে দেয়। তবে মানুষের ভোগান্তি কমেনি আমদানির চাল বাজারে আসার পরও। এবং খুব দ্রুত যে চালের দাম নামবে না সেটিও জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

দেশের মোট খাদ্য চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঘাটতি পূরণে সরকার ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে জিটুজিতে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত দাম বেশি পড়ার কারণে সেখান থেকে সরে আসে। তবে গেল একমাসে ভিয়েতনাম থেকে পৃথক চারটি চালানে প্রায় ৯৩ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চাল চট্টগ্রাম পৌঁছেছে। সরকার সম্প্রতি ভিয়েতনাম থেকে ৯০৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। বাকি প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন চাল চলতি বছরের মধ্যেই আসবে বলেও খাদ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে। সবশেষ চালানটি গত ৩১ জুলাই ভোরে ২৫ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন চাল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়।

খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভিয়েতনাম থেকে প্রতি মেট্রিক টন ৪৭০ মার্কিন ডলারে ৫০ হাজার মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল আমদানি করা হবে। এতে মোট খরচ হবে ১৯৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ভিয়েতনাম থেকে ৪৩০ মার্কিন ডলারে ২ লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল আমদানি করা হবে। এতে মোট খরচ হবে ৭১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গত ১৪ জুন দরপত্র ছাড়াই সরকারি পর্যায়ে এই চাল আমদানির অনুমতি দেয়।

এদিকে ভারত-থ্যাইল্যান্ডের বিকল্প হিসেবে চাল আমদানির জন্য দ্বিতীয় দেশ হিসেবে গত ২ আগস্ট কম্বোডিয়ার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ সরকার। ০২ আগস্ট দেশটির রাজধানী নমপেনে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং কম্বোডিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী প্যান সোরাসাক নিজ নিজ দেশের পক্ষে এ চুক্তিতে সই করেন। চুক্তির অংশ হিসেবে চলতি বছরেই ২ লাখ টন সাদা চাল এবং ৫০ হাজার টন আধা সিদ্ধ চাল আমদানি করবে বাংলাদেশ। আগামী অক্টোবরের মধ্যেই বাংলাদেশে এই আড়াই লাখ টন চাল রফতানি করা সম্ভব হবে বলে চুক্তি স্বাক্ষরের পর গণমাধমকে জানান প্যান সোরাসাক। আগামী ৫ বছরে বিভিন্ন মেয়াদে কম্বোডিয়া থেকে মোট ১০ লাখ টন চাল আমদানি করা হবে বলে ওই চুক্তিপত্রের বরাত দিয়ে খাদ্য অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, সরকার চলতি অর্থবছরে বিদেশ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা করেছে। প্রাথমিকভাবে ৬ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া থেকে ৫ লাখ টন চাল আমদানি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণে ও আমদানি শুল্ক নাগালের মধ্যে থাকায় চাল আমদানিতে মনোযোগ দিচ্ছে দেশের বেসরকারি পর্যায়গুলোও। এক জরিপে দেখা গেছে, গেল একমাবে বেসরকারিভাবে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। যা প্রায় গত এক বছরের মোট আমদানির সমান। গত অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল এক লাখ ৩৩ হাজার টন চাল।

তবে বেসরকারি কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে চাল আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চালের চাহিদা কম বলে দাবি করেছেন দিনাজপুরের চাল আমদানিকারক ললিত কেশরা। তিনি বলেন, আমদানির তুলনায় চাহিদা কম। আমদানির ধারা অব্যাহত থাকলে চালের দাম শিগগিরই আরও কমে যাবে। ভারতের ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি চালের দাম বৃদ্ধির কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তারা সাবেক দামেই ছাড়ছেন চাল।

স্থানীয় বাজার পরিদর্শনে দেখা যায়, বর্তমানে ৩৭ থেকে ৩৯ টাকা কেজিতে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে চাল বিক্রি হচ্ছে। ভারত থেকে প্রতি টন চাল ৩৯০ ডলার (প্রায় ৩০ হাজার টাকা) থেকে ৪৩০ ডলারে (প্রায় ৩৩ হাজার টাকা) আমদানি করা হচ্ছে।

এদিকে চলতি মাসের শুরুতে চালের মজুদ সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। এ সময়ে সরকারি খাদ্যগুদামে মজুদ চালের পরিমাণ ছিল মাত্র দেড় লাখ টন। এরপর ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানি ও স্থানীয় মিল মালিকরা চাল সরবরাহ করায় এখন মজুদ বাড়ছে। সবশেষ তথ্যানুযায়ী বর্তমানে ২ লাখ পাঁচ হাজার টন চাল মজুদ রয়েছে। ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়া ছাড়াও আন্তর্জাতিক দরপত্রে ২ লাখ টন চাল কেনার জন্য ৪টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এসব চালও আসতে পারে শিগগিরই।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খুচরা বাজারে মোটা চাল ৪৩ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে; যা আগে ৪৭ থেকে ৫০ টাকা ছিল। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩০ থেকে ৩৪ টাকা। এ হিসাবে এখন ৩৬ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অন্য চালের দাম তেমন কমেনি। মাঝারি মানের বিআর আটাশ চাল এখনও ৪৮ থেকে ৫০ টাকা কেজি। যা দর বেড়ে ৫০ থেকে ৫২ টাকা হয়েছিল। এই চাল গত বছরে ছিল ৪২ থেকে ৪৪ টাকা।

তবে বাজার ব্যবসায়ীদের ভাষ্য হচ্ছে- চালার দাম কম-বেশি হওয়ার ক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি মিল মালিকদের হাতে। মিল মালিকরা অর্ডার অনুযায়ী এখন চাল দিচ্ছেন। তবে আমদানি না বাড়লে দাম কমার সম্ভাবনাও কম। মোটা চালের দাম কিছুটা নমনীয় হলেও মাঝারি ও সরু চালের বাজারে এখনও আগুন।

এমতাবস্থায় প্রতিদিন ব্যাগ হাতে বাজারে গিয়েও অনেক গ্রাহকই পরিমাণের চেয়ে একটু কম চাল কিনছেন। তাদের প্রত্যাশা পরের দিন যদি দাম আরেকটু কমে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে চাল কিনতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্রেকিংনিউজকে জানান, মধ্যবিত্তের সংসারে তার ঘরে ৫টি পেট। প্রতিদিনের ভরপোষণেই যেখানে হিমশিম খেতে হয় তার উপর মাসের পর মাস চালের বাজারে এমন অসহনীয় দাম তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। সরকার ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি তার আহ্বান, অবিলম্বে চালের দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা হোক। এ দাবি শুধু ওই ক্রেতার একার নয়, গোটা দেশের সাধারণ ক্রেতাদেরও কথা সেই একটিই। চালের দাম কমুক, মানুষ দুবেলা দুমুটো ভাত পেটে পুড়ুক।

*

*

Top