Bhalukanews.com

শারদীয় উৎসব ও কিছু ভাবনা—–বাদল কৃষ্ণ বণিক

মহালয়ার বার্তায় আগমনী মা দুর্গা এই মর্তলোকে পূজিত হন  শরতের শুক্লা তিথিতে।  চণ্ডী’তে উল্লেখ্য যে স্বর্গরাজ্য যখন অমরত্ব বর লাভের পর মহিষাসুর স্বর্ণ দখল করে তখন তার হত্যাচার নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে স্বর্গের রাজা ইন্দ্র সহ দেবতারা দেবাদিদেব মহাদেব ব্রক্ষ্মা বিষ্ণু’র কাছে বিচার প্রার্থনা করেন। ইন্দ্রের প্রার্থনায় মহিষাসুরকে বদ করার জন্য মহাশক্তি দুর্গার আবির্ভাব ঘটে।

অমরত্ব বরলাভ করলেও মহিষাসুর মনে সবসময়ই একটা প্রশ্ন জাগ্রিত ছিল ” নারীর হাতে তার মরণআঘাত হবে “?  কিন্তু তার দম্ভ তার দাম্ভিকতা এতটাই ছিল যে, কেওই তাকে বদ করতে পারবেনা, আর নারী তো তার কাছে একেবারে তুচ্ছ । আকাশ পাতাল স্বর্গ মর্ত্য আধিপত্য বিস্তার করে দেবগণের উপর অত্যাচার নিপীড়ন করে তার বশ্যতা স্বীকার করার জন্য নির্যাতন করা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। নারীদের উপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বেশী। তাই মহিষাসুর চোখে নারীশক্তি তুচ্ছরূপ।

দেবী দুর্গা দশভুজা দশদিগন্তের মহাশক্তিতে আবির্ভূতা হলেন ব্রক্ষ্মা বিষ্ণু মহাদেবের আশির্বাদে । যে মহিষাসুরের ভয়ে প্রকম্পিত ছিল স্বর্গ মর্ত পাতালপুরী , যে শক্তি কখনো পরাভূত হবার নয় — দাম্ভিক অহংকার দম্ভভরে হত্যাচার নির্যাতন রোধ করার নয়। সেই মহিষাসুর পরাভূত হলো নারীশক্তির কাছেই।  পরিণতিতে শান্তিলাভ হলো স্বর্গে মর্তলোকে, সেই সাথে অসুরবিনাশিনী দুর্গার কাছে শেষ আকুলিত মহিষাসুরের , দেবীর দুর্গার সাথে পূজিত হওয়ার শেষ বাসনা। মাতৃশক্তি দুর্গা মাতৃত্ব বোধে মহিষাসুরকে স্থান দিলো তাঁর পাদপদ্মে।

এ তো চণ্ডী’তে উল্লেখিত দেবী দুর্গার সংক্ষিপ্ত বিবরণ বললাম। প্রতিবছর ই দেবী দুর্গা শরতকালে বাঙালী মনের ঘরে শারদীয় পূজায় পূজিত হয়ে থাকেন, তাছাড়া রামচন্দ্র যখন রাবণ বদে ব্যর্থমনোরথে তখন তিনি বসন্তকালে অকাল বোধন করলেন দেবী দুর্গাকে এক শত আটটি নীলপদ্ম ফুল দিয়ে , তখন আমরা বাঙালীরা বাসন্তী পূজা নামে অভিহিত করি। কথিত আছে যে রামচন্দ্র যখন পূজায় বসলেন তখন ১০৮টি নীলপদ্ম ফুল দিতে গিয়ে দেখেন থালায় ১০৭টি ফুল , তিনি আরো অস্থির হয়ে গেলেন, কোথায় পাবেন আরো একটি ফুল ?  তখন তিনি স্থির করলেন নীলপদ্মের বদলে তাঁর নয়ন দান করে অর্ঘ দিবেন মায়ের পাদপদ্মে।  রামচন্দ্র তাঁর তীর ধনূক দিয়ে যখন চোখ উঠাতে উদ্যত ঠিক তখনি ত্রিনয়নী মা দুর্গা রামের সামনে উপস্থিত ।

রামকৃষ্ণ মঠে সবসময় ই “কুমারী পূজার আয়োজন করা হয় এই দুর্গাপূজায়। শ্রীরামকৃষ্ণ পরম হংসদেব জীবন্ত কুমারীকে  পূজা করে বুঝালেন যে ,  ঘরের দুর্গা(কুমারী)কে কিভাবে মায়ের দর্শনে রাখা । সমাজে পরিবারে সকল মাতৃভক্তি যে সকল মেয়েদের জাগ্রত । স্নেহ মায়া মমতায় সকল মা জাতিতে নারীশক্তি প্রয়াস হোক।

সমাজের সকল অশুভশক্তি বিনাশ হোক এটাই দুর্গাপূজার মূল বক্তব্য । এই বিশ্বে অশান্তির বীজ বপনে আজ যারা অদমনীয় , তারাই বিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলছে শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোকে।  কাম ক্রোধ লোভ মোহে আচ্ছাদনে সমাজ রাষ্ট্র হুমকীর সম্মুখীন । হত্যা নির্যাতন ধর্ষনের সাথে ধর্মের নামে অধর্ম কার্যকলাপ যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার । জংগীবাদ সহ নারী ধর্ষন লুটতরাজে  সমাজ আজ দিশেহারা । বিশ্ব রাজনীতির কপটতায় মায়ানমার আজ উন্মাদন দেখাচ্ছে , জাতি গোষ্টি নির্মূল করা কোন ধর্মের কাজ নয়। অসুরতুল্য মনোভাব কখনোই সমাজ রাষ্ট্রের জন্য নিরাপদ নয়। সংখ্যাগুরুরা,  সংখ্যা লঘুর উপর নির্যাতন করে সুসংবাদ ডেকে আনে না। দেবালয় পুড়ে ছারখার করলে কি ঈশ্বর পুড়ে যায় ?  যাবে না কখনো।

বাঙালী সমাজে এই দুর্গাপূজা বহুল প্রচারিত প্রসারিত । যুগ যুগ ধরে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালী উৎসব পালনে যেমন আনন্দ বোধ করে তেমনি বাঙালীরা সৌহার্দপূর্ণ মিলনেও উদাহরণ তৈরী করে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা উপজেলা এমনকি গ্রামে গঞ্জে এই শারদীয় উৎসবে সার্বজনীন রূপ ধারণ করেছে।  উৎসব মানেই একে অপরের ভালবাসার বন্ধনে মিলনের সুর। তাই এই দুর্গাপূজা কে কেন্দ্র করে এক মহাউৎসবের আমেজ সারা বাংলাদেশে দেখতে পাই ।

আসুন ভেদাভেদ ভুলে মনের অসুরকে দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করি , সৌহার্দ সম্প্রীতি গড়ে তুলি।

” যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরূপেণ সংস্থিতা

নমোস্তসৈ নমোস্তসৈ নমোঃ নমঃ। “

*

*

Top