Bhalukanews.com

শ্রীপুরের নয়ন দৃষ্টিহীনতার কাছে হার মানেনি

গাজীপুর প্রতিনিধিঃ দুটি চোখের একটিতেও আলো নেই নয়ন মিয়ার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর শহরের বিভিন্ন হাট-বাজারে মালামাল ফেরি করে বিক্রি করেন তিনি। এক হাতে সাদা ছড়ি আর অন্য হাতে বৈদ্যুতিক বাতি, দাঁতের ব্রাশ, কলমসহ বিভিন্ন মালামালের ব্যাগ। যা উপার্জন হয় তা দিয়েই চলে নয়নের পরিবার। শুধু নিজের নয়, মা ও একমাত্র বোনের জীবন-জীবিকার দায়িত্বও পালন করছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নয়ন মিয়া। আড়াই বছর আগে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন সামান্য পুঁজির এই ব্যবসা।
২৭বছর বয়সী নয়ন মিয়া জানান, তার জন্ম ময়মনসিংহ জেলার গৌরিপুর উপজেলার বানারি গ্রামে। বাবা আব্দুল জলিল ছিলেন দিনমজুর। মা অন্যের বাড়িতে ঝি এর কাজ করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর ভিটেমাটি হারিয়ে গাজীপুরের শ্রীপুরে চলে আসেন। আড়াই বছর বয়সে তার টাইফয়েড জ্বর হয়েছিল। দরিদ্র বাবার পক্ষে সঠিক সময়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হারান দৃষ্টিশক্তি। পাঁচ বছর আগে তিনি বিয়ে করেছেন। হামিম নামে সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলেও রয়েছে তার। এরই মাঝে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা মারা যান। পাঁচ ভাই বোনের সংসারে ভাইয়েরা যে যার মতো আলাদা হয়ে যান। মা ও একমাত্র বোনের দায়িত্ব নেন তিনি। বর্তমানে তিনি শ্রীপুর পৌর এলাকার পিয়ার আলী কলেজের কাছে শাহিনের বাড়িতে বসবাস করেন। শ্রীপুরে এসে জীবিকা অর্জনের কোনও পথ না পেয়ে বিভিন্ন লোকজনের পরামর্শে শুরু করেন ভিক্ষা। দিনে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোমতে দিন চলছিল তার। তবে বিয়ে ও সন্তান জন্মের পর তার মাথায় নতুন চিন্তা ভর করে। বিবেকের তাড়নায় আড়াই বছর আগে ছেড়ে দেন ভিক্ষাবৃত্তি। জমানো পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা।
ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়ার বিষয়ে নয়ন বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর মা ও বোনকে নিয়ে বিপদে পড়েছিলাম। কয়েকদিন না খেয়েও থাকতে হয়েছে। অন্যের বাড়িতে কাজের জন্য শ্রীপুরে এসেছিলাম। অন্ধ বলে কেউ কাজ দেয়নি। শুধু ক্ষুধার জ্বালায় ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করি। কিন্তু হাতে সামান্য পুঁজি ও শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকা পরিচিত হওয়া মাত্রই ভিক্ষা ছেড়ে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেই। এখন শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকা আমার পরিচিত হয়ে গেছে। অন্যের সাহায্য ছাড়াই চলতে পারি। ব্যবসার আয় সামান্য হওয়া সত্ত্বেও আমি পুরো পরিবার নিয়ে সুখে আছি।’
নয়নের আশা ভবিষ্যতে যদি সামান্য ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা হতো তাহলে এ ব্যবসা ছেড়ে দোকান দিতেন। অনেকটা দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে ব্যবসার জন্য বের হতে হয়।
নয়নের স্ত্রী দুলেনা খাতুন বলেন, ‘নয়ন আত্ম প্রত্যয়ী। আমরা একই এলাকায় থাকতাম। তার বিভিন্ন গুণাবলী দেখে তাকে বিয়ে করি। সে ভিক্ষা ছেড়ে দেওয়ায় আমাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন তার স্বপ্ন একটি দোকান দেওয়ার। তার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য আমি মাওনার ক্রাউন উল নামে একটি কারখানায় কাজ নিয়েছি।’মাওনা চৌরাস্তার ফল ব্যবসায়ী সোহাগ মিয়া বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিন নয়ন মিয়াকে দেখি ফেরি করে বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করছে। তাকে দেখে অনেক সামর্থবান মানুষের মধ্যে পার্থক্য খুঁজি। তখন মানুষের বিবেকের পার্থক্যটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।’
শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মঞ্জুরুল হক জানান, সরকার ভিক্ষাবৃত্তি নিরুৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। নয়ন একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হতদরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। নয়নকে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করা হবে।

*

*

Top