Bhalukanews.com

সৌন্দর্যের খোঁজে হিমালয়-কন্যা পঞ্চগড়ে

পঞ্চগড়: ইতিহাস সমৃদ্ধ এই জনপদটিতে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন সভ্যতার বহু মূল্যবান সম্পদ। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে প্রাচীন জনপদ পঞ্চগড় ও সংলগ্ন এলাকায়। অবসরে ঘুরে আসতে পারেন বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে। একটি শহরকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যে উপাদান প্রয়োজন তার সবই পঞ্চগড় জেলায়  বিদ্যমান। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে পঞ্চগড় হতে পারে এক অসাধারণ জায়গা।

ভারতীয় উপমহাদেশে ‘পঞ্চ’ শব্দটি বিভিন্ন স্থানের নামের সাথে যুক্ত হয়েছে। যেমন- পঞ্চনদ, পঞ্চবটি, পঞ্চনগরী পঞ্চগৌড় ইত্যাদি। সুতরাং পঞ্চগৌড়ের একটি অংশ হিসেবে প্রাকৃত ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পঞ্চগড়ের নামকরণ হতে পারে। এই অঞ্চলের পাঁচটি গড়ের সুস্পষ্ট অবস্থানের কারণেই পঞ্চগড় নামটির উৎপত্তি।

ভিতরগড়, মিরগড়, রাজনগড়, হোসেনগড় ও দেবনগড়

পঞ্চগড় থেকে হেমন্ত ও শীতকালে পর্যবেক্ষণ করা যায় কাঞ্চনজংঘার অপরূপ দৃশ্য, রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র রকস মিউজিয়াম, সমতল ভূমিতে চা বাগান, বার আউলিয়ার মাজার শরীফ, মির্জাপুর শাহী মসজিদ, মহারাজার দিঘী, ভিতরগড় দুর্গনগরী, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, ভিতরগড়, মিরগড়, এশিয়ান হাইওয়ে, গোলকধাম মন্দির, তেঁতুলিয়া ডাক-বাংলো, সেখান থেকে দেখে আসুন হিমালয় আর এভারেস্ট।

ঢাকা থেকে হানিফ কিংবা নাবিল পরিবহনে যেতে পারেন পঞ্চগড়। ভাড়া পড়বে ৭ থেকে ৮ টাকা। রয়েছে গ্রীন লাইন, আগমনী, টি-আর ট্র্যাভেলসের এসিবাস। ভাড়া পড়বে এক থেকে দেড় হাজার টাকা। এই বাসগুলো যায় রংপুর পর্যন্ত। রংপুর থেকে পঞ্চগড়ে যেতে হবে আলাদা পরিবহনে। বিভিন্ন স্থানে বেড়ানোর জন্য পঞ্চগড় শহড়ের কেন্দ্রীয় বাসস্টেশন অথবা শহরের চৌরঙ্গী মোড় থেকে কার, মাইক্রো ভাড়া করতে পারেন। সারাদিনের জন্য রিজার্ভ কারের ভাড়া পড়বে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায়।

থাকবেন যেখানে-

পঞ্চগড় সার্কিট হাউজ, ডিসি কটেজ, পঞ্চগড়, জেলা পরিষদ ডাকবাংলো। রয়েছে চিনিকল রেস্ট হাউজ, তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো, বাংলাবান্ধা ডাকবাংলো, তেঁতুলিয়া পিকনিক কর্নার, দেবীগঞ্জ কৃষি ফার্ম গেস্ট হাউজ, বোদা ডাকবাংলো, রেশম প্রকল্প রেস্ট হাউজ ইত্যাদি। এ ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল।

বার আউলিয়া মাজার শরীফ:

বার আউলিয়া মাজার শরীফ পঞ্চগড় উপজেলা সদর হতে ৯ কি.মি. উত্তর-পূর্বে মির্জাপুর ইউনিয়নের বার আউলিয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ ভূমিতে অবস্থিত। বারজন ওলী খাজা বাবার নির্দেশে চট্টগ্রামসহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে আস্তানা গড়ে তুলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন, পরে স্থল পথে রওনা হয়ে ইসলাম প্রচার করতে করতে উত্তরবঙ্গের শেষ প্রান্ত এসে পৌঁছান এবং পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বার আউলিয়ায় আস্তানা গড়ে তুলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। আটোয়ারীর মাটিকে পুণ্য ভূমিতে পরিণত করে সময়ের বিবর্তনে ওলীদের এখানেই সমাহিত করা হয়। গড়ে ওঠে বার আউলিয়া মাজার শরীফ।

সমতল ভূমির চা বাগান:

সম্প্রতি পঞ্চগড় জেলা সদর ও তেঁতুলিয়া উপজেলায় শুরু করা হয়েছে সমতল ভূমিতে চা চাষাবাদ। বাংলাদেশে সমতল ভূমিতে এটাই প্রথম চা চাষাবাদ। চা চাষে এগিয়ে এসেছে বিশেষভাবে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট, ডাহুক টি এস্টেট, স্যালিলেন টি এস্টেট, তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি প্রভৃতি।

মির্জাপুর শাহী মসজিদ:

আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে মির্জাপুর শাহী মসজিদটি অবস্থিত। ফলকের ভাষা ও লিপি অনুযায়ী ধারণা করা হয় মোঘল সম্রাট শাহ আলমের রাজত্বকালে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। মসজিদটির দেয়ালে খোদাই করা রয়েছে টেরাকোটা ফুল এবং লতাপাতার নকশা। মসজিদের নির্মাণশৈলীর নিপুণতা ও দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য  দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।

মহারাজার দিঘি:

মহারাজার দিঘি পঞ্চগড় শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে অমরখানা ইউনিয়নে অবস্থিত। পাড়সহ এর আয়তন প্রায় ৮০০ × ৪০০ গজ। স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস পানির গভীরতা প্রায় ৪০ ফুট। দিঘিতে রয়েছে মোট ১০টি ঘাট। বিশাল দিঘির চারপাশে রয়েছে অনেক গাছগাছালির সবুজের কারুকার্য, স্নিগ্ধ সমীরণ, সৌম্য শান্ত পরিবেশ যা এখনো সবার কাছে বিরল মনে হয়।

দেখে আসুন হিমালয় আর এভারেস্ট:

পঞ্চগড় জেলার উত্তর দিকে শীত মৌসুমে মেঘমুক্ত এবং কুয়াশাবিহীন দিনে তাকালে চোখে পড়ে হিমালয় গিরিমালার নয়নাভিরাম দৃশ্য। তবে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরের পাশ ঘেঁষে প্রবাহিত মহানন্দা নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালে সূর্যের বর্ণিল আলোকচ্ছ্বটায় উদ্ভাসিত এভারেস্ট শৃঙ্গ দেখা যায়।

বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট:

বাংলাদেশের উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়া হিমালয়ের কোলঘেঁষে অবস্থিত। বাংলাদেশের সর্বোত্তরের স্থান বাংলাবান্ধা জিরো (০) পয়েন্ট ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। এটি বাংলাদেশের একমাত্র স্থলবন্দর যার মাধ্যমে তিনটি দেশের সাথে সুদৃঢ় যোগাযোগ গড়ে উঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

রকস মিউজিয়াম:

 

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ চত্বরে অবস্থিত রকস মিউজিয়ামটি। মিউজিয়ামে পঞ্চগড় জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক ও লোকজ সংগ্রহ রয়েছে প্রায় সহস্রাধিক। পঞ্চগড় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে রিকশাযোগে রকস মিউজিয়ামটিতে যাওয়া যায়।

ভিতরগড় দুর্গনগরী:

পঞ্চগড় উপজেলা সদর দপ্তর হতে প্রায় ১৫ (পনের) কিলোমিটার দূরত্বে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত প্রাচীন যুগের একটি বিরাট কীর্তি। গড় ও নগরীর অবস্থান প্রায় ১২ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে। ভিতরগড় দুর্গে একটি বড় দিঘি ও কয়েকটি ছোট ছোট দিঘি আছে এবং এর ভিতরে মন্দির, প্রসাদ ও ইমারতের এবং বাইরে পরিখা ও প্রাচীর এখনো দেখা যায়।

ভিতরগড়:

   

পঞ্চগড় শহর থেকে ১০ মাইল উত্তরে বাংলাদেশ- ভারত সীমান্ত বরাবর অবস্থিত এই গড়। আয়তনের দিক থেকে ভিতরগড় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গড়। প্রায় ১২ বর্গমাইল স্থানজুড়ে ভিতরগড়ের অবস্থান। ভিতরগড় দূর্গ নির্মাণের সঠিক কাল নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে ভিতরগড় আর ভিতরগড় দূর্গ একই সময়ে নির্মিত হয়নি। দূর্গের প্রাথমিক কাঠামোটি পৃথ্বীরাজ কর্তৃক আনুমানিক ৬ষ্ঠ শতকের দিকেই নির্মিত হয় বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।

মিরগড়:

যে ৫টি গড় নিয়ে ‘পঞ্চগড়’-এর নামকরণ করা হয়েছে তার মধ্যে মিরগড় অন্যতম। এই গড়টির অধিকাংশ অংশই এখন ভারতের মধ্যে চলে গেছে।

গোলকধাম মন্দির:

  

পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাংগা ইউনিয়নের শালডাংগা গ্রামে অবস্থিত গোলকধাম মন্দির। মন্দিরটি নির্মিত হয় ১৮৪৬ সালে। পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলা সদর হতে প্রায় ১২ কি. মি. উত্তর পশ্চিমে গোলকধাম মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরটি অষ্টাদশ শতকের স্থাপত্যের একটি চমৎকার নিদর্শন। গ্রিক পদ্ধতির অনুরূপ এর স্থাপত্য কৌশল।

তেঁতুলিয়া ডাক-বাংলো:

পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরের ঐতিহাসিক ডাক বাংলোর নির্মাণ কৌশল অনেকটা ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের। জানা যায়, এটি নির্মাণ করেছিলেন কুচবিহারের রাজা। তেঁতুলিয়া ডাক-বাংলোর পাশাপাশি নির্মিত রয়েছে পিকনিক কর্নার। উঁচুতে ডাক-বাংলো এবং পিকনিক কর্নার মহানন্দা নদীর তীর ঘেঁষা ভারতের সীমান্ত-সংলগ্ন  সুউচ্চ গড়ের উপর সাধারণ ভূমি হতে প্রায় ১৫ হতে ২০ মিটার অবস্থিত। সেখান থেকে উপভোগ করা যায় হেমন্ত ও শীতকালে কাঞ্চন জংঘার সৌন্দর্য ।

ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের দূরত্ব ৪৫৭ কিলোমিটার। আর পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। তেঁতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা ১৭ কিলোমিটার। দেশের যেকোনো স্থান থেকে সড়ক, রেল ও বিমানে করে পঞ্চগড় যাওয়া যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে সরাসরি এখানে আসতে পারেন।

*

*

Top