Bhalukanews.com

নিভে গেল এক আলোকচিত্রীর স্বপ্ন

রাজীবুল হাসান:: পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে গত সোমবার বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা (বিএস২১১) বিমানে নেপালে যাচ্ছিলেন ফটোগ্রাফার এফএইচ প্রিয়ক। রাজধানী কাঠমান্ডুতে রানওয়ে নামার সময় হঠাৎ বিকট শব্দে আগুন ধরে যায় বিমানে। মুহূর্তেই প্রিয়কের স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বিমানে থাকা ৩২ বাংলাদেশির মধ্যে স্ত্রী এ্যানী, মামাতো ভাই মেহেদী মাসুদ, ভাইয়ের স্ত্রী কামরুন্নাহার স্বর্ণা বেঁচে থাকলেও এফএইচ প্রিয়ক ও তার শিশু কন্যা মারা যান।

নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা লাভ করা প্রিয়ক ছোটবেলা থেকেই ছবি তোলার নেশায় বিভোর। চেয়ে ছিলেন ফটোগ্রাফির কায়দায় সমাজের অবাঞ্চিত মানুষের অবয়ব বিশ্বের কাছে তুলে দরবার। ছবির মতো মানুষকেও তিনি ভালোবাসতেন। তাই ফটোগ্রাফির সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মানুষ।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রিয়ক ২০১৩ সালে অ্যামেচার ফটোগ্রাফি বাংলাদেশের আয়োজনে ফটো প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর সমাজের সুবিদা বঞ্চিত মানুষের ছবি তোলে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সোসাইটি অফ ফটোগ্রাফি আর্ট থেকে পেয়েছেন অ্যাওয়ার্ড। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর তাকে দিয়েছিলেন এ পুরস্কার। ২০১৬ সালে অর্জন করেছেন বেঙ্গল ইমেজ ১ম জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা প্রদর্শনী পুরস্কার। গুণী এই ফটোফাগ্রাফার আন্তর্জাতিক মানের অনেক ফটো এজেন্সির সাথেও যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের বিখ্যাত ফটো মাস্টার জিএম আকাশের তত্তাবধানে বহুদিন কাজ করেছেন।

গাজীপুরের শ্রীপুরে পিতা শরাফত আলী ও মা ফিরোজার একমাত্র পুত্র এফএইচ প্রিয়ক (৩২)। ছয় বছর আগে পারিবারিকভাবে প্রিয়ক-এ্যানী দম্পতির বিয়ে হয়। বিয়ের ছয় মাসের মাথায় বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সংসারের হাল ধরেন প্রিয়ক। গত দুই বছর ছয় মাস আগে প্রিয়কের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান। নাম রাখেন তামারা প্রিয়ন্ময়ী। সংসারে সব সুখ যেন ওই শিশুকে ঘিরে। মেয়ের উড়োহাজারে উঠার বায়না আর নিজের ফটোগ্রাফির টানেই নেপাল যাচ্ছিলেন প্রিয়ক।

প্রিয়কের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইকবাল আহমেদ নিশাত বলেন, তিনি মানুষকে ভীষণভাবে পাঠ করতে পারতেন। এই সমাজ নিয়ে তার ছিল গভীর চিন্তা। প্রিয়কের মৃত্যুতে আমরা হারিয়েছি একজন চিন্তাশীল মানুষকে।

এফএইচ প্রিয়কের আরেক বন্ধু ফারুক জানান, সিএনয়া, হিপা প্রতিযোগীয় বহু ছবি পাঠিয়ে রেখেছে প্রিয়ক। সে বলেছিল পুরস্কার পেতে পারে। তার একটা স্বপ্ন ছিল নিজের তোলা ছবি দিয়ে ফটো মিউজিয়াম বানাবে, তা আর হলো না।

মঙ্গলবার বিকেলে প্রিয়কের বাড়িতে (নগরহাওলা) গিয়ে দেখা যায়, মা ফিরোজা বুকফাটা চিৎকার করে বলছেন, আমার বাবারে জীবন ভিক্ষা দেও আল্লাহ, স্বজনের কান্নার রোলে পুরো এলাকা শোকের সাগরে ভাসছে। বিমান বিধ্বস্তের খবর পাওয়ার পর থেকে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন বৃদ্ধ মা। বারবার সংজ্ঞহীন হয়ে পড়ছেন তিনি।

এদিকে প্রিয়কের লাশ আনতে তার পরিবারের পক্ষ থেকে ৪ সদস্যের একটি দল নেপালে পৌঁছেন সকাল দশটায়। তারা জানিয়েছেন, নেপালের টিচিং হাসপাতালে প্রিয়ক ও তার কন্যার লাশের সন্ধ্যান পাওয়া গেছে। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরছি।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহানা আকতার জানান, খবর পেয়ে রাতেই বিমান বিধ্বস্তের কবলে পড়া ওই পরিবারের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। এ কষ্টের কোনো সান্ত্বনা হয় না। তবুও মানবিক কারণেই তাদের পাশে দাঁড়ানো। এ শোক সারাদেশের।

*

*

Top