Bhalukanews.com

‘শবে বরাত’

হাদিসের পরিভাষায় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান’; যাকে মানুষ শবে বরাত বা লাইলাতুল বারাআত কিংবা ভাগ্য রজনী হিসেবে জানে। এ নিয়ে বর্তমান সময়ে বাড়াবাড়ির যেমন শেষ নেই; তেমনি একেবারে ছাড়াছাড়ি বা অবহেলারও শেষ নেই।

আসুন, জেনে নিই, শবে বরাত কি? লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বানও বা কি? আর তাতে মুসলিম উম্মাহর করণীয়-

>> রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে পাকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বাক্যটি এসেছে। এ বাক্য দিয়ে রাতটির নামকরণ করা হলে প্রিয়নবির সুন্নাতের সবচেয়ে সুন্দর ও পরিপূর্ণ অনুসরণ হয়।

শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটিকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বলে সম্বোধন করলে সুন্নাত পালন হবে। আর বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ‘শাবানের মধ্যরজনী’, ফারসিকগণ ‘শবে বরাত’ ও আরবের লোকেরা ‘লাইলাতুল বারাআতও বলতে পারেন।
প্রত্যেক ভাষার মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষায় এ রাতকে নামকরণ করলে তা বৈধ হবে ঠিক; কিন্ত সুন্নাত পালন হবে না এটা নিশ্চিত।

>> আরবি বারাআত শব্দটির বাংলা অর্থ হলো- মুক্তি, বিমুক্তি, ছিন্ন, বিচ্ছিন্ন, দায়মুক্তি ইত্যাদি। আরবি শব্দটা যখন ফারসি ভাষার ভেতর প্রবেশ করে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয় তখন তা উচ্চারনের দিক থেকে ‘বরাত’ নামে আত্ম প্রকাশ করে। আর তাতে তখন অর্থগত পরিবর্তনও ঘটে।

বাংলা ভাষায় বরাত শব্দটা এখন অনেকটাই সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা বা নিজস্ব ভাষঅয় পরিণত হয়েছে; যার মানে দাঁড়ায় ভাগ্য। আর ‘শবে বরাত’ মানে ‘ভাগ্য রজনী’।

যার ফলে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর সাথে এখানে একটা ব্যাপক বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। রাতটা হচ্ছে ক্ষমার রজনী। এখানে রিজিক বা আগামী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারণ সম্পর্কিত কোনো কথা কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

>> এ রাত সম্পর্কে হাদিসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ইবন মাজাহ’তে একটি পরিচ্ছেদ আছে। যেখানে কয়েকটি হাদিস বর্ণিত আছে। উম্মাহর আলেমগণ তাকে জারহ-তাদীল করেছেন। এতে একটি হাদীস সহীহ বলে সাব্যস্ত হয়েছে। আর এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত কয়েকটি হাদিসকে যায়িফ বলেছেন।

এ রাতের আমল সম্পর্কিত হাদিসকে আলেমগণ মাওজু বলেছেন। তবে সহিহ হাদিসের দ্বারা এটা প্রমাণিত যে-
আল্লাহ তাআলা এ রজনীতে সব মুসলিমের বিষয়ে মনোনিবেশ করবেন এবং তাদের ক্ষমা করে দিবেন। তবে সে ব্যক্তিকে অবশ্যই শিরক ও হিংসা মুক্ত হতে হবে।

হাদিসের উদ্ধৃতি অনুযায়ী কোনো কোনো আলেম এ রাতকে বোনাস হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন। অর্থাৎ ব্যক্তি সারা বছর ইবাদত করলে এবং শিরক-হিংসা থেকে মুক্ত হলে এ রাতে ঘুমিয়ে থাকলেও আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করে দেবেন।

>> এ রাতের আমল সম্পর্কে বর্ণিত অধিকাংশ হাদীসই মাওজু। ফিকহের গ্রন্থাবলীতেও এ রাতের বিশেষ সালাত সম্পর্কে সর্তক করা হয়েছে।

ইমাম নববি রহমাতুল্লাহি আলাইহিসহ আলেমগণ এ রাতে বিশেষ নামাজ আদায় এবং এ উদ্দেশ্যে মসজিদে মুসলিমগণের একত্রিত হওয়াকে ‘আল-বিদআত আল-মুহদাসাহ’ বলেছেন।

তবে এ রাতে কবর জিয়ারত ও দোয়ার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। ফলে অন্যান্য রাতের মতো এ রাতে কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ) এবং পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করা যেতে পারে।

>> মসজিদে সাধারণত ইলমে দ্বীনের জ্ঞানার্জনের মসজলিস সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ নয়। তবে আলেমগণ বিশেষ পদ্ধতিতে বিশেষ পরিমাণ নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে একত্রিত (আল-ইহতিফাল) হওয়াকে বেদাআত বলেছেন। নিঃসন্দেহে আলেমগণ এ মতটি প্রদানকালে তাঁরা তাঁদের সময়কালীন সমাজ ব্যবস্থা ও পরিস্থিতি বিচারে এনেছিলেন।

তবে বর্তমান সময়ে রুসুম রেওয়াজের অনুসরণের নিয়ত ব্যতিত মসজিদ বিমুখ মুসলিম উম্মাহকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোচনায় অধিকতর অংশগ্রহণ বাড়াতে এ রাতে মসজিদে মসজিদে কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ইলমে দ্বীনের সহিহ জ্ঞানের মজলিসের আয়োজন করা ‘আল-বিদআত আল-মুহদাসাহ’ হবে না।

বরং ইলমে দ্বীনের জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে মসজিদে মসজিদে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ পালন করলে যুব সমাজের বেসামাল শবে বরাত পালনের পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যাবে। আর যদি এ ধরণের আয়োজন বন্ধ হয়ে যায় তবে যুবক সমাজ আতশবাজি ও হালুয়া-রুটি বিলানোর সংস্কৃতিতে নিজেদের জড়িয়ে নিতে বেশি উৎসাহি হবে।

>> লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান উপলক্ষে আয়োজিত দ্বীনি আলোচনায় বিজ্ঞ আলেমগণ ইসলামের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে উপস্থিত মুসলিমগণকে বুঝাবেন। এ রাত সম্পর্কে বিশুদ্ধ আলোচনা উপস্থাপন করবেন।

অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি এড়িয়ে চলার পাশাপাশি অবহেলার বিষয়ও তুলে ধরবেন। ইতোমধ্যে যেসব বাড়াবাড়ি সংঘঠিত হয়েছে সে সম্পর্কে ভূল সংশোধন করবেন।

কোনোভাবেই এ রাতকে পবিত্র কুরআন নাজিলের রাত তথা ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ বলে উপস্থাপন করা যাবে না। সমাজের মানুষের কাছে তা তুলে ধরতে হবে। যা বলা অসত্য, হাস্যকর ও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আর এটা কুরআনের সঙ্গে প্রকাশ্য সীমালঙ্ঘনও বটে।

একটা কথা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে-

>> ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’’ উপলক্ষে পরিবারের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজনের মধ্যে ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো বিশ্বাস জড়িত থাকলে তা মোটেই জায়েজ হবে না। তবে সাধারণভাবে অভাবগ্রস্তকে খাবার পরিবেশ, দান-সাদকা ইত্যাদি করা সাওয়াবের কাজ।

>> ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’-এ বিরক্তিকর শব্দ দুষণের ফটকা ও আতশবাজী ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। গোনাহ মাফের নিয়তে সন্ধ্যা রাতে গোসল, কবরে মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালানো ও গোলাপজল ছিটানোসহ এ সব বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকতে হবে।

বাড়ি ঘরে আলোকসজ্জা, কবরস্থানে আলোকসজ্জা ইত্যাদিও পরিহার করা আবশ্যক। কারণ শবে বরাতের নামে ইসলামে এ সব মারাত্মক সীমালঙ্ঘন। তা কোনোভাবে বৈধ নয়।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে শবে বরাতের নামে দুনিয়ার যাবতীয় ফেতনা ও সীমালঙ্ঘন থেকে মুক্ত থাকার তাওফিক দান করুন। মসজিদে মসজিদে ইলমে দ্বীনের মজলিস, কিয়ামুল লাইল এবং পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, কবর জিয়ারতসহ কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক ইবাদত-বন্দেগি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

***copy_online

*

*

Top