Bhalukanews.com

ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না আবরারের

আবরারসহ দুই ছেলে ছিল ফরিদা ফাতেমীর। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে ‘এ’ এবং ‘ও’ লেভেল পাস করে বিইউপিতে পড়ছিলেন আববার। ছোট ছেলে আবীদ আহমেদ চৌধুরী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র। বসুন্ধরা ডি ব্লকে ভাড়া বাসায় থাকতেন তারা।

ছেলেকে শেষ বিদায় দিতে এসে মা ফরিদা ফতেমী বলছিলেন, ‘আমার বাবাকে কখনো একা ছাড়তে চাইতাম না। ও বলতো, আম্মু তুমি যদি আমাকে একা চলাফেরা করতে না দাও, তবে আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট হবো কীভাবে? সবাই আমার বাবাটাকে অনেক পছন্দ করতো। পরিবারের মাথার মুকুট ছিলি তুই। আমাদের একা ফেলে চলে গেলি কীভাবে? আমি কীভাবে তোকে ছাড়া থাকব? তুই একবার ফিরে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে মা বলে ডাক বাবা।’

ছেলেকে কবরে শুইয়ে দেয়ার দৃশ্য দেখে আবরারের বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আরিফ আহাম্মেদ চৌধুরী মুশড়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘জীবনে অনেক কষ্টের সময় পার করেছি। ছেলেকে কবরে শুইয়ে দেয়ার মতো কষ্ট আর কিছুর সঙ্গে মিলবে না। জীবনের সকল সফলতা যেন একটি ঘটনায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। আমার বাবাটা আর আমার কাছে আসবে না, কোন দিন আর আমি তার মুখে বাবা ডাক শুনতে পারব না।’

Abrar

আবরারের ছোট চাচা মাসুদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আবরার কমিশনার র্যাংকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীতে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তার ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীর ডাক্তার হওয়া। এ বছর মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় সফল না হওয়ায় আগামী বছর আবারও মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ইচ্ছা ছিল তার। সে ছিল সকলের আদরের পাত্র। বই পড়ার প্রতি তার আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। নিয়মিত নামাজ পড়তো আবরার। সকলে তাকে অনেক পছন্দ করতো।’

রাকিব হাসানসহ আবরারের বেশ কয়েকজন সহপাঠী বলেন, ‘মাত্র তিন মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে সকলের মন জয় করে ফেলেছিল আবরার। সে অনেক ভালে ছাত্র হওয়ায় আমরা তাকে সিজিপি-৪ বলে ডাকতাম। কারণ আমরা জানতাম, সে বেস্ট রেজাল্ট করবে। এ কারণে আমরা সকলে তাকে এই নামে ডাকতাম।’

তারা আরও বলেন, ‘ক্লাসে স্যারদের কোনো প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই তার মুখে উত্তর চলে আসতো। মনে হতো পাঠ্যবইয়ের সকল কিছু তার পড়া হয়ে গেছে। সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ছেলে হয়েও তার কোনো অহঙ্কার ছিল না। বইয়ের কোনো পড়া নিয়ে সমস্যা হলে যে কোন সময় তাকে নক করলে সহজভাবে সমাধান করে দিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। সহপাঠী, সিনিয়র ও স্যাররা তাকে অনেক ভালোবাসতো।’

কবরস্থানে আবরারকে চিরশায়িত করতে উপস্থিত হয়েছিল তার স্কুল জীবনের বন্ধুরাও। তারা জানান, ‘বসুন্ধরার প্রে-পেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে আবরার ‘এ’ এবং ‘ও’ লেভেল পাশ করে। দুটি পরীক্ষায় সে সর্বোচ্চ ফল অর্জন করে। তারা বর্তমানে একসঙ্গে পড়ালেখা না করলেও স্কুল ও কলেজ জীবনের বন্ধুদের মধ্যে আগের মতোই সুসম্পর্ক ছিল।’

তারা বলেন, ‘ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে আবরারের অনেক কৌতুহল ছিল। এ সংক্রান্ত বই অনেক পড়তো সে। দেশ-বিদেশের খবর রাখতো। বিভিন্ন বই পড়ে আমাদের সঙ্গে তা শেয়ারও করতো। সে ছিল অনেক চুপচাপ ও শান্ত স্বভাবের। কখনও কারো সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখিনি। সকলেই তাকে ভালোবাসতো।’

আবরারের বন্ধুরা আরও বলেন, ‘তার কাছে সবসময় একটি কলমের মাথা থাকতো। কথা বলার সময় সে হাতের কব্জি ঘুরিয়ে কলমের মাথাটা নেড়ে নেড়ে কথা বলতো। বিষয়টি নিয়ে আমরা অনেক হাসাহাসিও করতাম। তার মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না আমরা।’

*

*

Top