ধর্ম

যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন খ্রিস্টান নারী নাথালিয়েলে

ইসলাম মানুষের সৌভাগ্যের জন্য সবচেয়ে পরিপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দেয়। আর এ জন্যই আল্লাহ ইসলামকে তাঁর নির্বাচিত, পরিপূর্ণ ও একমাত্র ধর্ম বলে উল্লেখ করেছেন।

ইসলামের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হল, এ ধর্ম নারীর মর্যাদা পুনরুজ্জীবিত করেছে। ইসলাম নারী অধিকারের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো ও যৌক্তিক বক্তব্য তুলে ধরেছে। তাই ইসলামের মধ্যে নারী খুঁজে পায় হারানো সব অধিকার এবং তারা এ ধর্মকে নিজ প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে দেখতে পায়। ফলে সত্য-সন্ধানী নারীরা মনে-প্রাণে ঝুঁকে পড়ছেন এ পবিত্র ধর্মের দিকে। ফরাসি নও-মুসলিম নারী নাথালিয়েলে লে-বেররে এই সৌভাগ্যবান নারীর মধ্যে অন্যতম।

ফরাসি নও-মুসলিম নারী নাথালিয়েলে লে-বেররে বড় হয়েছেন একটি ক্যাথলিক পরিবারে। তার বাবা-মা ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান ছিলেন বলে লে-বেররে-কে পড়াশুনা করতে হয়েছে ক্যাথলিক স্কুলে। এই স্কুলের ধর্মীয় অভিভাবকদের কথা ও কাজের অসঙ্গতি তাকে খুব পীড়া দিত। ফলে খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি তার বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল।

তবে স্রস্টার প্রতি তার বিশ্বাসে কখনও ফাটল ধরেনি। বরং লে-বেররে সব সময়ই ধার্মিক হতে চেয়েছেন। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন ধর্মই মানুষকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু ক্যাথলিক খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিলেন মিসেস লে-বেররে।

এ অবস্থায় নাথালিয়েলে লে-বেররে বেশ কিছু দিন ধরে বৌদ্ধ ধর্ম ও খ্রিস্ট ধর্মের প্রোটেস্টান্ট শাখা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। কিন্তু এইসব ধর্মমতও তেমন একটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি তার কাছে। আর ইসলাম সম্পর্কে খুব বেশি নেতিবাচক প্রচারণার কারণে এ ধর্মের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখা দেয়নি লে-বেররে’র মধ্যে। বরং ইসলামকে তিনি ভয় করতেন।

মিসেস লে-বেররে পড়াশুনার জন্য জার্মানি যান এবং জার্মানিতে পড়াশুনার সময় কয়েকজন মুসলমানের সঙ্গে পরিচিত হন। বিভিন্ন জাতির সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ও আগ্রহের সুবাদে তিনি ইসলাম সম্পর্কেও জানতে আগ্রহী হন।

তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আমার পড়াশুনার বিষয় ছিল রাজনীতি বিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্ব। তাই আমি মনে করতাম কোনো জনপদ বা জাতির রাজনীতি বোঝার জন্য আগে তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা উচিত। অন্যদিকে মধ্য-এশিয়া, ইরান ও ভারত উপমহাদেশ সম্পর্কে আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল। আর এইসব কারণে আমি ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা ও পড়াশুনা শুরু করি। এ কারণেই জার্মানিতে পড়াশুনা শেষ করার পর যখন ফ্রান্সে ফিরে আসি তখন ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশুনা শুরু করি।”

মানব জাতির ইতিহাসে আশুরার বিপ্লব এক অনন্য ও অশেষ কল্যাণকর বিপ্লব। এ বিপ্লব দেদীপ্যমান সূর্যের মতই এমন এক মহাপ্রাণের উতস যার আলো আলোকিত করছে সব যুগের মুক্তিকামী ও ন্যায়বিচারকামী মানুষকে। ব্রিটেনের খ্যাতনামা প্রাচ্যবিদ এডওয়ার্ড ব্রাউন বলেছেন,

“এমন কোনো হৃদয় কি পাওয়া যাবে যে হৃদয় কারবালার ঘটনা ও বক্তব্য শুনে দুঃখিত হয় না? এমনকি অমুসলমানদের মধ্যেও এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যিনি এই যুদ্ধে প্রদর্শিত আত্মিক পবিত্রতাগুলোকে অস্বীকার করবেন যে পবিত্রতাগুলো নিবেদিত হয়েছিল ইসলামকে রক্ষার জন্য।”

আশুরা বিপ্লবের অতুল মহত্ত্ব, ঔজ্জ্বল্য ও শ্রেষ্ঠত্ব মিসেস লে-বেররেকে প্রভাবিত করেছে গভীরভাবে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন,

“আপনাদের কাছে ব্যাপারটা খুব আকর্ষণীয় মনে হতে পারে যে, আমি ইসলাম সম্পর্কে একেবারে গোড়ার দিকে যে ক’টি বই পড়েছিলাম তার মধ্যে ‘আশুরা’ বইটি ছিল অন্যতম। হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবারের কাহিনীতে ইমাম ও তাঁর কন্যা সকিনার মধ্যে সংলাপের অংশটি আমার হৃদয়কে এতটা নাড়া দিয়েছে যে মনে হয়েছে, কেবল সকিনা নাম উচ্চারণ আমার ভেতরে প্রশান্তি যোগাচ্ছে।

ইসলাম সম্পর্কে আমি সে সময় যে পড়াশুনা করছিলাম তার কথা বাদ দিয়েই বলতে পারি যে, কারবালার ঘটনা, ইমাম হুসাইন (আ.) ও সকিনা আমার জীবনে পরিবর্তনের সূচনা-বিন্দু। এইসব ঘটনা আমার মধ্যে এত প্রভাব ফেলেছে যে মুসলমান হওয়ার পর আমি আমার জন্য সকিনা নামটি বেছে নিয়েছি। আমি যখন গভীর সমস্যায় ডুবে ছিলাম তখন এই নামটি আমাকে বিস্ময়কর প্রশান্তি দিত এবং এর ফলে আমি সব কিছু ভুলে যেতাম।”

গবেষণা ও পড়াশুনার পর মিসেস লে-বেররে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব উপলবিদ্ধ করতে সক্ষম হন এবং তিনি মুসলমান হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শুধু তাই নয় তিনি তার মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করারও সিদ্ধান্ত নেন।

এ প্রসঙ্গে ফরাসি নও-মুসলিম সকিনা বা সাবেক লে-বেররে বলেছেন, “আমি মুসলমান হয়েছিলাম পড়াশুনার জন্য আমেরিকায় থাকার সময়। আমেরিকার একটি মসজিদে একজন আলেম, একজন কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমান ও কয়েকজন ইরানি বন্ধুর সমাবেশে আমি কলেমায়ে শাহাদাতাইন উচ্চারণ করি। আমার প্রতি তাদের দয়া ছিল ইসলাম ও ইরানের দিকে আমার আকৃষ্ট হওয়ার আরেকটি বড় কারণ। সেই দিনটি আমার জীবনের একটি অবিস্মরণীয় দিন। অবশ্য মুসলমান হওয়ার পর পরই নানা রকম সমস্যার ঢল নেমে আসে আমার ওপর।”

ফরাসি নও-মুসলিম নারী লে-বেররে মুসলমান হওয়ায় তার বন্ধুরা নাখোশ হয়। তারা এ ব্যাপারে লে-বেররে’র যুক্তি বা কথা না শুনেই তাকে প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি বাবা-মায়ের কাছেও তিরস্কৃত হন লে-বেররে। বিশেষ করে তার মা অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হন। কারণ, তিনি ছিলেন কঠোর ইসলাম-বিদ্বেষী। টেলিফোনে মেয়ের মুখে যখন শুনতে পান যে সে মুসলমান হয়েছে তখন তিনি এত জোরে চিৎকার দিয়ে ওঠেন যে, লেবেররে মর্মাহত ও খুবই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। এমনকি লেবেররে’র মা টেলিফোন রেখে দেন রাগ করে। এরপর দশদিন ধরে টেলিফোন করার সাহস পাননি এই ফরাসি নও-মুসলিম নারী। এরপরের ঘটনা শোনা যাক, লেবেররে’র নিজের ভাষায়:

“একদিন নিজ এপার্টমেন্টে ঢুকে সবিস্ময়ে দেখলাম যে বাবা ও মা আমাকে দেখতে এসেছেন। আমাকে দেখা মাত্রই মা শুরু করলেন কান্নাকাটি। তিনি যত সময় নিউইয়র্কে ছিলেন এ সময়ে তার কান্না আর থামেনি। বাবা-মা মনে করতেন মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী। তাই নিশ্চয়ই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সহযোগিতা করছি ও তাদের গ্রুপের সদস্য হয়েছি। পাশ্চাত্যে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে গণমাধ্যমগুলোর অপপ্রচারের প্রভাবেই এ ধরণের মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে আমার মা-বাবার মধ্যে। এইসব গণমাধ্যমের প্রচারণায় হিজাবকে নারীর ওপর জুলুম অত্যাচারের মাধ্যম ও নারী স্বাধীনতা হরণের হাতিয়ার বলে তুলে ধরা হয়।

তাই আমার বাবা মায়ের মধ্যেও এই একই ধারণা জন্ম নেয়াটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। তারা মনে করতেন ইসলামকে ধর্ম হিসেবে বেছে নেয়ার মাধ্যমে আমি নিজের ধ্বংসের পথই বেছে নিয়েছি। আমি তাদের কাছে ইসলামের সত্যতা তুলে ধরার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো সত্ত্বেও তাদের চিন্তা-চেতনায় কোনো পরিবর্তন দেখা দেয়নি এবং আমার মায়ের কান্নাও থামেনি। উল্টো তারা আমাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার এবং পড়াশুনার খরচ বন্ধ করে দেয়ারও হুমকি দেন। এ সময় বাবা কিছুটা শান্ত আচরণ করতেন। কিন্তু তিনি বলতেন : ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় তোমার মাথায় ওই স্কার্ফ বা ওড়না রাখবে না।”

লেবেররে’র মা-বাবা জানতে, ইসলামে বাবা-মা-কে খুব শ্রদ্ধা করা হয় এবং সন্তানরা বাবা-মায়ের কথা মেনে নিতে বাধ্য। তাই তারা মেয়েকে ফ্রান্সে ফিরে আসার নির্দেশ দেন।

এ প্রসঙ্গে লেবেররে বলেছেন, ফ্রান্সে ফিরে আসার পর আরো কিছু সমস্যার শিকার হন নওমুসলিম লেবেররে। কিন্তু বাবা-মায়ের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে তাদের সঙ্গেই থাকতে হচ্ছিল তাকে। লেবেররে’র হিজাবের কারণে তার বাবা-মা লজ্জা অনুভব করতেন। তাই তারা তাকে ঘরের বাইরে খুবই কমই যেতে দিতেন। তারা এইসব চাপের মাধ্যমে লেবররেকে আবারও খ্রিস্টান হতে বাধ্য করতে চাইছিলেন। কিন্তু তিনি প্রতিরোধ চালিয়ে যান। নও-মুসলিম সকিনা বা সাবেক লেবেররে’র এমন কঠিন দিনগুলোর অবসান ঘটে যখন তার এক ইরানি বন্ধুর সহযোগিতার সুবাদে তিনি ইরানে আসতে সক্ষম হন। নিউইয়র্কেই তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এই ফরাসি নারীর। ইরানে আসার আমন্ত্রণ সকিনার মনোবলকে আরো উজ্জীবিত করে।

ইরান সফরের পর দেশটি সম্পর্কে পাশ্চাত্যের নেতিবাচক প্রচারণাগুলোর অসারতা স্পষ্ট হয় সাবেক লেবেররে বা বর্তমান সকিনার কাছে। ফরাসি নও মুসলিম এই নারী এ প্রসঙ্গে বলেছেন,

“ইরানে এসে আমি অনেক কিছু দেখেছি এবং নানা বিষয় সম্পর্কে বিভিন্ন দিক থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছি। ইরানে নারীর মর্যাদা ভূমিকা আমাকে অভিভূত করেছে। এখানে নারীকে তার বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখিয়ে উচ্চ মর্যাদা হাসিল করতে হয় না বরং ইরানের নারীরা নিজেদের প্রকৃত যোগ্যতার বলেই উচ্চতর মর্যাদা পাচ্ছেন। আর পাশ্চাত্যে নারীর অবস্থা হচ্ছে ঠিক এর বিপরীত।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button